কলম, পেন্সিল ও মহাকাশের মহাকাব্য: শূন্য অভিকর্ষে লেখার নেপথ্যের বিজ্ঞান ও ইতিহাস

 

ভূমিকা: পৃথিবীর টান ছেড়ে যখন লেখার পালা

কল্পনা করুন, আপনি ভাসছেন। চারপাশে গ্রহ-নক্ষত্রের মেলা, নিচে পৃথিবী নামক নীল গ্রহটি আপন কক্ষপথে ঘুরছে। আপনি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (ISS) বসে আছেন, হাতে গুরুত্বপূর্ণ ডেটা বা কোনো পর্যবেক্ষণ নোট করার তাগিদ। কিন্তু একি! আপনার প্রিয় বলপয়েন্ট কলমটি কালি দিচ্ছে না, পেন্সিল ব্যবহার করতেও কেমন যেন দ্বিধা। কেন? কারণ আপনি আছেন মহাকাশে, যেখানে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি প্রায় অনুপস্থিত। এই আপাতদৃষ্টিতে সরল কাজটিলেখামহাকাশের শূন্য অভিকর্ষ (Microgravity) পরিবেশে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ।

আজকের এই লেখায় আমরা ডুব দেব সেই চ্যালেঞ্জের গভীরে। জানব কেন সাধারণ কলম বা পেন্সিল মহাকাশে অকার্যকর বা ঝুঁকিপূর্ণ, কীভাবে বিজ্ঞানীরা এই সমস্যার সমাধান করলেন, বিখ্যাত "স্পেস পেন"-এর জন্মকথা এর পেছনের প্রযুক্তি, প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা (মিথ) এবং বর্তমানে নভোচারীরা লেখার জন্য কী কী সরঞ্জাম ব্যবহার করেন। চলুন, শুরু করা যাক মহাকাশে লেখার এই রোমাঞ্চকর অভিযাত্রা!

. কেন সাধারণ কলম মহাকাশে 'অচল' হয়ে যায়?

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত বেশিরভাগ কলম, বিশেষ করে বলপয়েন্ট এবং ফাউন্টেন পেন, কাজ করার জন্য একটি অদৃশ্য শক্তির উপর নির্ভর করেআর তা হলো মাধ্যাকর্ষণ (Gravity)

  • বলপয়েন্ট পেনের কার্যপ্রণালী: বলপয়েন্ট পেনের ডগায় একটি অতি ক্ষুদ্র ধাতব বল (ball) থাকে, যা অবাধে ঘুরতে পারে। কালির রিফিলের ভেতরের কালি মাধ্যাকর্ষণের টানে ধীরে ধীরে নিচের দিকে নেমে আসে এবং ওই বলটির সংস্পর্শে থাকে। যখন আমরা লিখি, বলটি কাগজের উপর ঘোরার সময় কালির একটি পাতলা স্তর কাগজে ছড়িয়ে দেয়। সহজ কথায়, কালিকে ডগার দিকে ঠেলে দেওয়ার মূল কাজটি করে মাধ্যাকর্ষণ।
  • মহাকাশে সমস্যা: মহাকাশে (যেমন ISS-এর ভেতরে) মাধ্যাকর্ষণ শক্তি পৃথিবীর তুলনায় লক্ষ লক্ষ গুণ কম। এই 'মাইক্রোগ্র্যাভিটি' পরিবেশে কালি স্বাভাবিকভাবে পেনের ডগার দিকে প্রবাহিত হতে পারে না। ফলে, আপনি কলমটি সোজা বা উল্টো যেভাবেই ধরুন না কেন, কালি আসবে না। এটি অনেকটা স্ট্র দিয়ে জল পান করার সময় যদি উল্টো হয়ে যান, তেমন ব্যাপারজল আর উপরে উঠবে না। ফাউন্টেন পেনের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা, কারণ সেখানেও কালিকে নিবের দিকে আনার জন্য মাধ্যাকর্ষণ কৈশিক ক্রিয়া (Capillary Action) উভয়ই প্রয়োজন, কিন্তু মাধ্যাকর্ষণের অনুপস্থিতি প্রক্রিয়াটিকে ব্যাহত করে।

. পেন্সিল: আপাত সমাধান, কিন্তু বিপজ্জনক!

যদি কলমই কাজ না করে, তাহলে সহজ সমাধান তো পেন্সিল! পেন্সিলের গ্রাফাইট (যা ভুলবশত 'সিস' বা 'lead' নামে পরিচিত) কাগজের ঘর্ষণে আটকে যায়, এর জন্য মাধ্যাকর্ষণের প্রয়োজন নেই। তাহলে নাসা বা অন্যান্য মহাকাশ সংস্থা কেন শুরু থেকেই পেন্সিল ব্যবহার করল না?

এর পেছনে রয়েছে কিছু গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকি:

  • গ্রাফাইট কণার বিপদ (Graphite Dust Hazard):
    • স্বাস্থ্য ঝুঁকি: পেন্সিল দিয়ে লেখার সময় বা এর முனை ভেঙে গেলে গ্রাফাইটের সূক্ষ্ম কণা বাতাসে মিশে যায়। পৃথিবীর পরিবেশে এই কণাগুলো দ্রুত নিচে থিতিয়ে পড়ে, কিন্তু মহাকাশযানের বদ্ধ পরিবেশে, মাইক্রোগ্র্যাভিটির কারণে, এরা অনির্দিষ্টকাল ধরে বাতাসে ভাসতে থাকে। এই ভাসমান কণা নভোচারীদের চোখ, নাক বা ফুসফুসে প্রবেশ করে মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।
    • কারিগরি ঝুঁকি (ইলেকট্রনিক্স): গ্রাফাইট বিদ্যুৎ সুপরিবাহী (Electrically Conductive) মহাকাশযানের ভেতরে থাকে অসংখ্য জটিল সংবেদনশীল ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি। যদি এই পরিবাহী গ্রাফাইট কণাগুলো কোনো সার্কিট বোর্ডে বা সংযোগস্থলে গিয়ে পড়ে, তবে শর্ট সার্কিট ঘটিয়ে দিতে পারে। এর ফলে যন্ত্র বিকল হওয়া থেকে শুরু করে আগুন লাগার মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। অ্যাপোলো মিশনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর নাসা অগ্নি নিরাপত্তা নিয়ে অত্যন্ত সতর্ক হয়ে গিয়েছিল।
  • দাহ্যতা (Flammability): সাধারণ কাঠের পেন্সিলের মূল উপাদান কাঠ এবং গ্রাফাইটদুটোই দাহ্য। মহাকাশযানের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে, বিশেষ করে যেখানে অক্সিজেনের ঘনত্ব বেশি থাকতে পারে, সেখানে সামান্য স্ফুলিঙ্গও বড় অগ্নিকাণ্ডের কারণ হতে পারে। তাই দাহ্য পদার্থের ব্যবহার যথাসম্ভব এড়িয়ে যাওয়া হয়।

. মিথ বনাম বাস্তবতা: সোভিয়েত ইউনিয়ন, পেন্সিল এবং নাসা

একটি বহুল প্রচলিত গল্প শোনা যায় যে, নাসা যখন মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করে অত্যাধুনিক 'স্পেস পেন' তৈরি করতে ব্যস্ত, তখন বাস্তববাদী সোভিয়েতরা সস্তা পেন্সিল ব্যবহার করেই মহাকাশে কাজ চালিয়ে নিয়েছে। গল্পটি শুনতে মজার হলেও এটি সম্পূর্ণ সত্য নয় এবং বেশ খানিকটা অতিরঞ্জিত।

  • বাস্তবতা: সোভিয়েত মহাকাশচারীরা প্রথমদিকে গ্রাফাইট পেন্সিলের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তারা গ্রাফাইট পেন্সিলের পরিবর্তে গ্রিজ পেন্সিল (Grease Pencil) বা ওয়াক্স পেন্সিল (Wax Pencil) ব্যবহার করতেন। এগুলো মোম বা একই ধরনের পদার্থ দিয়ে তৈরি হয় এবং লেখার সময় কণা তৈরি করে না, ফলে ঝুঁকি অনেক কম ছিল। তবে এগুলোর লেখা সহজেই মুছে যেত বা স্পষ্ট হতো না।
  • পরবর্তী পরিবর্তন: সোভিয়েতরাও পরে গ্রাফাইট পেন্সিলের কিছু উন্নত সংস্করণ এবং বিশেষ করে আমেরিকানদের তৈরি ফিশার স্পেস পেন ব্যবহার শুরু করে। সুতরাং, বিষয়টা এমন নয় যে এক পক্ষ বোকার মতো অর্থ ব্যয় করেছে আর অন্য পক্ষ খুব চালাকি করে সস্তায় কাজ সেরেছে। উভয় পক্ষই নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে এবং সময়ের সাথে সাথে উন্নত প্রযুক্তির দিকে এগিয়েছে।

. বিস্ময়কর উদ্ভাবন: ফিশার স্পেস পেন (The Fisher Space Pen - AG7)

মহাকাশে লেখার সমস্যাটির একটি যুগান্তকারী সমাধান নিয়ে আসেন আমেরিকান উদ্ভাবক কলম প্রস্তুতকারক পল সি. ফিশার (Paul C. Fisher) তিনি এবং তার কোম্পানি, ফিশার পেন কোম্পানি, সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং নিজস্ব অর্থায়নে (প্রায় মিলিয়ন ডলার) একটি বিশেষ কলম তৈরি করেন যা AG7 (Anti-Gravity 7) নামে পরিচিতি পায় এবং এটিই সেই বিখ্যাত 'স্পেস পেন'

  • মূল প্রযুক্তি:
    • চাপযুক্ত নাইট্রোজেন কার্তুজ (Pressurized Nitrogen Cartridge): স্পেস পেনের আসল জাদু লুকিয়ে আছে এর কালির কার্তুজে। এটি সাধারণ রিফিলের মতো নয়। এর ভেতরে কালিকে বাইরের দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য প্রায় ৩৫ পিএসআই (PSI - Pounds per Square Inch) চাপে নাইট্রোজেন গ্যাস भरा থাকে। এই গ্যাসীয় চাপ কালিকে costanteভাবে বলপয়েন্টের ডগার দিকে ঠেলতে থাকে, ফলে লেখার জন্য মাধ্যাকর্ষণের কোনো প্রয়োজনই হয় না। আপনি যে কোনো কোণে, এমনকি উল্টো করেও লিখতে পারবেন।
    • থিক্সোট্রপিক কালি (Thixotropic Ink): স্পেস পেনের কালিও সাধারণ নয়। এটি একটি বিশেষ ধরনের ভিস্কো-ইলাস্টিক (Viscoelastic) বা থিক্সোট্রপিক (Thixotropic) কালি। এর মানে হলো, কালিটি স্থির অবস্থায় জেলির মতো ঘন বা অর্ধ-কঠিন (semi-solid) থাকে, কিন্তু যখন পেনের ডগায় থাকা টাংস্টেন কার্বাইডের বলটি লেখার সময় ঘোরে, তখন সৃষ্ট চাপ ঘর্ষণের (Shear Stress) কারণে কালিটি সাময়িকভাবে তরল হয়ে যায় এবং মসৃণভাবে বেরিয়ে আসে। লেখা বন্ধ করলে বা চাপ সরালে কালি আবার ঘন হয়ে যায়। এর ফলে কালি লিক করে না বা শুকিয়ে যায় না।
  • স্পেস পেনের অবিশ্বাস্য ক্ষমতা:
    • শূন্য অভিকর্ষ বা মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে কাজ করে।
    • যেকোনো কোণে (Any angle), এমনকি উল্টো করেও লিখতে পারে।
    • অত্যন্ত ঠান্ডা (-৩৪° সেলসিয়াস বা -৩০° ফারেনহাইট) থেকে অত্যন্ত গরম (+১২১° সেলসিয়াস বা +২৫০° ফারেনহাইট) তাপমাত্রায় কার্যকর।
    • পানির নিচে (Underwater) লিখতে পারে।
    • তৈলাক্ত বা ভেজা পৃষ্ঠের (Greasy surfaces) উপরও লিখতে সক্ষম।
    • এর কালির আয়ুষ্কাল অত্যন্ত দীর্ঘ, প্রায় ১০০ বছর।
  • নাসার মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের মিথ খণ্ডন: আগেই বলা হয়েছে, নাসা এই কলম তৈরির জন্য মিলিয়ন ডলার খরচ করেনি। পল ফিশার এটি ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরি করার পর নাসা এবং সোভিয়েত স্পেস এজেন্সি উভয়ই এর কার্যকারিতা কঠোরভাবে পরীক্ষা করে। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর নাসা ১৯৬৭ সালে অ্যাপোলো মিশনের জন্য এই কলমগুলো ক্রয় করে। প্রতিটি কলমের জন্য নাসা মাত্র $.৩৯ থেকে $.০০ (বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী) ডলার পরিশোধ করেছিল, যা তখনকার সময়েও খুব বেশি ছিল না, বিশেষ করে এর গবেষণা উন্নয়নের খরচের তুলনায়। ১৯৬৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নও তাদের সয়ুজ মহাকাশযানের জন্য ১০০টি স্পেস পেন এবং ১০০০টি রিফিল ক্রয় করে। এটি ছিল স্নায়ুযুদ্ধের যুগেও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার এক বিরল উদাহরণ।

. বর্তমানে মহাকাশে লেখার সরঞ্জাম: স্পেস পেন এবং আরও অনেক কিছু

ফিশার স্পেস পেন আজও মহাকাশচারীদের একটি নির্ভরযোগ্য লেখার সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে প্রযুক্তি থেমে থাকেনি। বর্তমানে নভোচারীরা লেখার নোট করার জন্য বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম ব্যবহার করেন:

  • ফিশার স্পেস পেন: নির্ভরযোগ্যতার কারণে এটি এখনও বহুল ব্যবহৃত।
  • যান্ত্রিক পেন্সিল (Mechanical Pencils): কাঠের পেন্সিলের তুলনায় যান্ত্রিক পেন্সিল কিছুটা নিরাপদ, কারণ এতে কাঠের অংশ থাকে না এবং গ্রাফাইট ভেঙে কণা তৈরির ঝুঁকিও কিছুটা কম (যদিও শূন্য নয়) নভোচারীরা বিশেষ ধরনের যান্ত্রিক পেন্সিল ব্যবহার করেন।
  • বিশেষ মার্কার (Specialized Markers): মহাকাশের পরিবেশের জন্য বিশেষভাবে তৈরি, -বিষাক্ত (non-toxic) এবং দ্রুত শুকিয়ে যায় এমন মার্কার ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন সারফেস বা যন্ত্রপাতির উপর চিহ্ন দেওয়ার জন্য। শার্পি (Sharpie) ব্র্যান্ডের কিছু মার্কারও ব্যবহৃত হয়।
  • গ্রিজ বা ওয়াক্স পেন্সিল: কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে এখনও ব্যবহৃত হয়।
  • ডিজিটাল ডিভাইস (Digital Devices): আধুনিক মহাকাশ মিশনগুলোতে ট্যাবলেট (যেমন আইপ্যাড), ল্যাপটপ এবং অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। নভোচারীরা এগুলো ব্যবহার করে ডেটা লগিং, চেকলিস্ট দেখা, নোট নেওয়া, -বুক পড়া এবং পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেন। এটি কাগজের ব্যবহার কমিয়েছে এবং ডেটা ম্যানেজমেন্টকে অনেক সহজ করেছে। তবে, পাওয়ার সোর্স, রেডিয়েশন এবং ডিভাইসের স্থায়িত্ব এখানে চ্যালেঞ্জ।

উপসংহার: ক্ষুদ্র কলমে মানব সভ্যতার বৃহৎ লাফ

মহাকাশে লেখার মতো একটি সাধারণ কাজের পেছনের বিজ্ঞান ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর আরামদায়ক পরিবেশ ছেড়ে মহাকাশের প্রতিকূলতায় টিকে থাকা এবং কাজ করার জন্য মানুষের কতটা উদ্ভাবনী ক্ষমতা সূক্ষ্ম পরিকল্পনার প্রয়োজন। একটি সামান্য কলম বা পেন্সিলের সীমাবদ্ধতা থেকে শুরু করে ফিশার স্পেস পেনের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির উদ্ভাবনএই যাত্রা মানুষের অজানাকে জানার অদম্য ইচ্ছা এবং যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষমতার প্রতীক। পরের বার যখন কলম হাতে নেবেন, একবার মহাকাশচারীদের কথা ভাববেন, যারা আমাদের পক্ষ থেকে মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে ব্রতী, এমনকি লেখার মতো সাধারণ কাজটিও যাদের জন্য এক অসাধারণ প্রকৌশলের ফসল।

Post a Comment

0 Comments